২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১২:১৫
জাতিসংঘে ভাষণে ট্রাম্পের ১০টি মিথ্যা

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহে বিজয়ী, সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে/কিন্তু এই চিত্রের বড় একটি অংশ পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): নিউইয়র্ক টাইমস ও সিএনএনের মতো গণমাধ্যমের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভাষণের বিভিন্ন অংশে ট্রাম্প হয় পরিসংখ্যানকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে বলেছে, অথবা যেসব ঘটনা এখনো চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছায়নি, সেগুলোকে নিশ্চিত সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

১- বিশ্বে ৬০ শতাংশ তেল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি

ট্রাম্প বলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেল নিয়ন্ত্রণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যের সঙ্গে এই দাবি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই দেশের সম্মিলিত তেল মজুত বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় ২২ শতাংশ এবং বৈশ্বিক উৎপাদনে তাদের সম্মিলিত অংশ প্রায় ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ ৬০ শতাংশের দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিসংখ্যানের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।

২- গাজা যুদ্ধের সমাপ্তির দাবি

ট্রাম্প গাজা যুদ্ধের সমাপ্তিকে নিজের অন্যতম সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এমন ফলাফলকে সমর্থন করে না। যুদ্ধবিরতির অর্থ পুরোপুরি হামলা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয় এবং যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। তাই শুধু যুদ্ধবিরতি অর্জনকে যুদ্ধের সম্পূর্ণ সমাপ্তির সমতুল্য বলা যায় না।

৩- মাদক পাচার ৯৭ শতাংশ বন্ধ করার দাবি

ট্রাম্প দাবি করেছে, মাদক পাচারকারী নৌযানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলা সমুদ্রপথে মাদক পরিবহনের ৯৭ শতাংশ বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু এত বড় হ্রাসের পক্ষে উপস্থাপিত প্রমাণ নেই। বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে দেখা যায়, মাদক পাচার নেটওয়ার্কের একটি অংশ কেবল তাদের রুট পরিবর্তন করেছে। ফলে ৯৭ শতাংশের সংখ্যাটি প্রমাণিত পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বড় এবং পর্যাপ্ত ভিত্তিহীন একটি দাবি বলে প্রতীয়মান হয়।

৪- আটটি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানোর দাবি

ট্রাম্প বলেছে, হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর তিনি আটটি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। তবে সিএনএনের পর্যালোচনায় দেখা যায়, তার তালিকায় থাকা অন্তত কয়েকটি ঘটনা মূলত তার প্রেসিডেন্ট থাকার সময় সংঘটিত যুদ্ধই ছিল না। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও রুয়ান্ডার ক্ষেত্রে শান্তিচুক্তি সংঘাতের সম্পূর্ণ সমাপ্তি বোঝায়নি এবং গাজাতেও হামলা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া ট্রাম্প নিজেই ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় যুদ্ধ শুরু করেছেন—এমন দাবিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৫- ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণের দাবি

ট্রাম্প বলেছে, সে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। কিন্তু সিএনএন জানিয়েছে, এই অঙ্কটি যাচাই করা সম্ভব নয়। এমনকি হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা অঙ্কও প্রায় ১১.২ ট্রিলিয়ন ডলার। তাছাড়া এই অঙ্কের মধ্যে প্রতিশ্রুতি, মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ এবং এমন কিছু অঙ্গীকার রয়েছে, যেগুলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের অর্থ বহন করে না।

৬- প্রায় সীমাহীন অস্ত্র ও গোলাবারুদ থাকার দাবি

ট্রাম্প বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এত বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে যে সেগুলোর সব ব্যবহার করার কথা কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেলের প্রতিবেদন এবং কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের মূল্যায়নে বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদের ঘাটতি, উৎপাদনসংক্রান্ত সমস্যা এবং কিছু মজুত কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এমনকি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর সম্পর্কেও মজুত পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

৭- ওয়াশিংটনে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমার দাবি

ট্রাম্প বলেছে, ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে। সিএনএন সামগ্রিক অপরাধের পরিসংখ্যান দিয়ে এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি। স্থানীয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত নিবন্ধিত অপরাধের সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি এবং ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় সামগ্রিক হ্রাস প্রায় ২৩ শতাংশ—৮৭ শতাংশ নয়।

৮- ‘পৃথিবী শীতল হয়ে যাওয়ায়’ জলবায়ু পরিবর্তনের নামকরণের দাবি

ট্রাম্প বলেছে, যারা একসময় বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন, পরে পৃথিবী শীতল হয়ে যাওয়ায় তারা এর নাম জলবায়ু পরিবর্তন করে দেয়। বৈজ্ঞানিক তথ্য এই দাবির বিপরীত চিত্র দেখায়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৫ সাল পর্যন্ত আগের ১১ বছর ছিল রেকর্ডকৃত সময়ের উষ্ণতম বছরগুলো। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালও রেকর্ডের অন্যান্য বছরের তুলনায় উষ্ণতম তিন বছরের অন্তর্ভুক্ত।

৯- ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংসের দাবি

ট্রাম্প তার ভাষণে আবারও ইরানের পারমাণবিক হুমকিকে মার্কিন নীতির যৌক্তিকতা হিসেবে তুলে ধরেছে এবং ইরানের সক্ষমতা ধ্বংসের কথা বলেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের বিষয়ে ওয়াশিংটনের প্রাথমিক দাবিগুলো নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কংগ্রেসের এক বৈঠকে মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে হামলার সাফল্যের মাত্রা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নও ট্রাম্পের সর্বোচ্চ মাত্রার দাবির সঙ্গে ভিন্নতা দেখিয়েছে।

১০- ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ের দাবি

 ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইরানের যুদ্ধ সম্পর্কে তার বর্ণনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেকে একটি সফল ও নির্ধারণমূলক অভিযানের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে, অথচ যুদ্ধ সপ্তম মাসে প্রবেশ করেছে এবং এখনো শেষ হয়নি।

সিএনএন জানিয়েছে, জাতিসংঘে ট্রাম্প আবারও ইরানকে ‘ধ্বংসের’ হুমকি দিয়েছেন এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য একটি চুক্তির কথাও বলেছে। এই বৈপরীত্য থেকে বোঝা যায়, ইরান ইস্যু এখনো ওয়াশিংটনের জন্য সমাধান হয়নি।

ভাষণের আগেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী কি না—এমন এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ‘অনেক অগ্রগতি’র কথা বলে। অথচ একই সিএনএন প্রতিবেদনে এমন একটি জরিপের উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে দেখা যায়, মাত্র প্রায় এক-চতুর্থাংশ মার্কিন নাগরিক পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের প্রতি সন্তুষ্ট। মার্কিন জনমতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও মনে করে না যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ওয়াশিংটন বিজয়ী হয়েছে।

Tags

Your Comment

You are replying to: .
captcha